জাতীয় বাজেট ২০২২-কাদের জন্য বাজেট ? ঈশিতা মুখার্জি

২ ফেব্রুয়ারি ২২ (বুধবার)

২০২২ সালের আর্থিক বাজেট পেশ করলেন সংসদে অর্থমন্ত্রী। ৯১ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ততম প্রতিবেদন । এর চেয়ে কম বললেও দেশের মানুষের কিছু যায় আসত না কারণ এই বাজেটে জানা যায় না সরকার দেশের মানুষের জন্য কি করবে।

কয়েকটি স্পষ্ট প্রশ্ন অর্থমন্ত্রীকে করা যায়ঃ


এক, বাজেটে ৬০ লক্ষ নতুন চাকরির কথা আছে। কিন্তু কিভাবে তা কি তিনি বলেছেন? একভাবে বলেছেন । সরকার গতিশক্তি বলে এমন ৭টি ক্ষেত্রে পরিকাঠামো সৃষ্টি করবে, এমন স্টার্ট আপের সুযোগ তৈরী করবে যে আত্মনির্ভর হয়ে বেকার যুবক যুবতী নিজেরাই নিজেদের কাজে নিযুক্ত করবে, এমনই গল্প তিনি আমাদের শোনালেন। অর্থমন্ত্রীর কি একথা অজানা যে ২০২১ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ৫৩০ লক্ষ? কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবার জন্য সরকার কোথায় ব্যয়বরাদ্দ করল দেখা যাক। সরকারি প্রকল্পে কাজ নিশ্চিত হত এবং এই অতিমারির সময়ে মানুষের যা দাবি ছিল তাকে নস্যাৎ করে হাসি হাসি মুখে অর্থমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন যে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের বিশেষ দাবিদার নেই, তাই দেখা গেল তাতে বরাদ্দ ২৫.৫% কমে হল ৭৩,০০০ কোটি টাকা । বরাদ্দ বাড়ল না, কমে গেল উলটে সমস্ত কর্মসংস্থান প্রকল্পে। অর্থাৎ ঋণ নিয়ে নিজস্ব উদ্যোগ খোল- এ ভাবেই কাজ সম্ভব। সরকার ব্যয় করতে পারবে না । তাহলে ৬০ লক্ষ চাকরির হিসেব কে ঠিক করল? তা প্রধানমন্ত্রী , অর্থমন্ত্রীর মনের ধারণা।


দুই, ২০২২ বাজেট পড়ে কারুর বোঝবার জো নেই যে এই দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে । বিশ্ব ক্ষুধার সূচকে ভারতের স্থান ১১৬ টি দেশের মধ্যে ১০১। জাতীয় পরিসংখ্যানেই আছে ১৮ লক্ষ শিশু অতিরিক্ত অপুষ্টিতে ভুগছে ২০২১ সালে । অথচ অঙ্গনওয়ারি , মিড-ডে-মিল প্রকল্পে বরাদ্দ নেই বললেই চলে । গত বছরও ৩৫% শিশু মিড-ডে-মিল পায় নি , এই তথ্য সরকারের কাছে থাকার পরেও কার জন্য তৈরি হল এই বাজেট? শিশুদের কল্যাণখাতে বরাদ্দের ৫৭০০ কোটি টাকা কম হয়েছে গতবছর । এর পরেও বরাদ্দ কমানো হল ।


তিন, ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের চাপে কৃষিবিল বাতিল হলেও এই বাজেটে সম্পূর্ণ ভাবে কৃষকদের অবজ্ঞা করা হল । তাদের কোন একটি দাবিও জায়গা পেল না বাজেটে । সারের উপর ভর্তুকি ২৫% কমিয়ে দিয়ে সারের দাম বাড়ানো হল এবং ফসল ফলানোর খরচ বেড়ে গেল । এ ছাড়াও ফসল সংগ্রহ করে এফ সি আই এর গুদামে তোলার জন্য ব্যয় ২৮ % কমে গেছে । কৃষি এবং কৃষক উন্নয়ন দপ্তরের বাজেট একচুলও বাড়েনি অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির হার ধরলে আদতে কমে গেছে। এ তো মারাত্মক কৃষক বিরোধিতা এবং কর্পোরেটের পোয়াবারো করার প্রক্রিয়া । গ্রামোন্নয়ন দপ্তরে মোট বাজেট বরাদ্দ ১৩.৩ % কমানো হল । গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্দশাগ্রস্ত চেহারা অতিমারির সময়ে আমরা দেখেছি। দলে দলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছেন কাজের খোঁজে , রোজগারের খোঁজে । আমরা তো দেখেছি , সরকার তো বাজেটে দেখতে পায়নি বলেই মনে হয় ।


চার, গুরুত্ব পায়নি তফশিলি জাতি, উপজাতি ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য প্রকল্প , মহিলাদের কর্মসংস্থান বা ভালো ভাবে বাঁচার কথা । অথচ অতিমারির ফলে দেশের এই মানুষেরাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আর আর্থিকভাবে আরো বিপন্ন হয়েছেন, এই সত্যকে একেবারেই উপেক্ষা করল বাজেট । এত মানুষ বিপন্ন হলেন, কাজ হারালেন , অভুক্ত থাকলেন, শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হল-কিন্তু বাজেট বুঝিয়ে দিল আরেকবার যে দেশের সরকার এদের জন্য নয় ।


পাঁচ, এই বাজেটে ডিজিটাল মুদ্রা, ডিজিটাল লেনদেন , ডিজিটাল শিক্ষাদান নানা কথা আমরা শুনলাম । দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডিজিটাল মুদ্রা চালু করবে । এত ডিজিটালের আধিক্যে সরকার একটা তথ্য হয় গোপন করছে দেশবাসীর কাছে অথবা কোন আমল দিচ্ছে না । তা হল আমাদের দেশের কত মানুষ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেন? ৪০% দেশবাসীর বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না । ইন্টারনেট পরিষেবা কিনতে হয় বেসরকারী পরিষেবা থেকে নগদ টাকায় যা কোনমতেই সরকার বহন করে না । মোবাইল ফোন টাও নিজে কিনতে হয় । মোবাইল ফোনের দাম কমিয়েছে বাজেটে, অর্থাৎ নিজেকে ফোন, পরিষেবা সব কিনে তবে ডিজিটাল দেশে যুক্ত হওয়া যাবে । সরকারের তাহলে দায়িত্ব কি? বাজেট এই প্রযুক্তি দেশে আনতে কি কাজ করবে? এর কোন উত্তর নেই বাজেটে ।


ছয়, বাজেটে আয়-ব্যয়ে কোন পরিবর্তন নেই । আমাদের দেশে অতিমারির পর যেভাবে আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে তা আসলে প্রাক-অতিমারি যুগেই শুরু হয়েছিল । ২০২১ সালে দেশের ধনীতম পরিবারগুলির সম্পদ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল । দেশের ধনীতম ১০টি পরিবারের হাতে রয়েছে দেশের ৫৭% অর্থ । অথচ এই ৫৭% অর্থের উপর কোন কর বসানো হল না । কিন্তু বাজেটে যে কোম্পানিগুলি এই অতিমারির সময়ে মুনাফা করল তাদেরই আরো মুনাফা করার ব্যবস্থা করে দিল। তাহলে এই বাজেট কাদের জন্য ?


দেশের বেশির ভাগ মানুষ আজ আর্থিক ভাবে বিপন্ন থেকে আরো বিপন্ন হচ্ছে । জিনিষপত্রের দাম প্রতিদিন বাড়ছে । কাজ নেই । অভুক্ত মানুষ । সরকারি চিকিৎসা, শিক্ষা ব্যবস্থা বেহাল । কিন্তু বাজেটে এর কোন প্রতিফলন নেই । প্রশ্ন এটাই, কেন্দ্রে যে সরকার আছে তা আদৌ কাদের সরকার ? একে একে সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণ করছে সরকার । ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাও তুলে দিয়ে বেসরকারিকরণ করে দিচ্ছে । বীমা ব্যবস্থাও বেসরকারিকরণ করার পরিকল্পনা পাকা করল এই বাজেটে । তাই আবারো প্রশ্ন- এই বাজেট কার জন্য পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী? বিপুল সংখ্যক দেশবাসীকে বাইরে রেখে “দেশপ্রেমী” সরকার পেশ করল দেশদ্রোহী বাজেট ।

Spread the word

Leave a Reply