আমাদের যতদূর মনে রাখতেই হবে – একটি স্মৃতিচারণা

ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গ এমনকি ব্রিটিশ উপনিবেশের শেষের দুই দশক হয়ে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতা ওলটাতে গেলেও যার নামটিকে কিছুতেই বাদ দেওয়া যাবে না তিনিই জ্যোতি বসু। ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট রাজনীতির একজন অন্যতম ব্যাক্তিত্ব, কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ সৈনিক হিসাবে তার নাম আমাদের সবাইকে মনে রাখতেই হয়। তার নিজের আত্মজীবনী “যত দূর মনে পড়ে” বইতে তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার সংকলন করে গেছেন – একেবারে স্বকীয় ভঙ্গিতেই। সেই বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে, প্রকাশ করে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।

এই লেখায় সেই বই থেকেই কিছু নির্দিষ্ট অংশকে বাছাই করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেইসব নির্দিষ্ট অংশকে বাছাই করা এবং একটি লেখায় সাজিয়ে তোলার সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জ্যোতি বসু’রই বলা বিশেষ একটি কথা মাথায় রেখে – ভারতে ইতিহাস বিকৃতি হয় বড় বেশি। এদেশের শাসকেরা নান সময়ে সেই ইতিহাস বিকৃতির হাত ধরে নানা কুকর্ম করেছেন, এখনও করছেন। সেইসবকিছুর বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের সজাগ থাকতে হয়, জনগনকে সজাগ রাখতেও হয়।

সেই উদ্দেশ্যেই তার জীবনীগ্রন্থের সেই সব অংশকে বেচে নেওয়া হয়েছে যা আমাদের সাধারণ আলোচনার মধ্যে বড় বেশি একটা আসে না, কিন্তু আসা উচিত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে জ্যোতি বসুর স্মরণ যত বেশি হয়, কিভাবে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে পাশ করে ফিরে এসে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে আগামী জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত তিনি নিজের ইচ্ছাতেই গ্রহণ করেছিলেন সেই আলোচনাও একই অনুপাতে হওয়া দরকার, আজকের দিনে সেই প্রয়োজন আরও বেশি। সেই দিন থেকে শুরু করে ১৯৭৭ সালের ২১ জুন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করা অবধি তার জীবন এক কথায় শিক্ষণীয়, পার্টির তরুন প্রজন্মের জন্য সেদিনের জ্যোতি বসু’র কাজ একটি পাঠ্যক্রম বলা চলে।

নিচের লেখায় “যত দূর মনে পড়ে” বইয়ের নানা অংশকে কোথাও সরাসরি আবার কোথাও প্রয়োজনমতো বাচ্য পরিবর্তনের পরে ব্যবহার করা হয়েছে – সবটাই একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। আজকের যুবসমাজ যাতে একথা স্পষ্ট বুঝতে পারে এদেশের বুকে কমিউনিস্টরাই দেশের জনগণের স্বার্থরক্ষায় অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে অনেক বেশি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে।

ভারতে কমিউনিস্টরা কেমন সরকার চায়?

কমিউনিস্ট পার্টি চাই এমন এক জনগণের সরকার যা অন্যান্য নানা কার্যক্রমের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করবে –

১. পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতা।

২. শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য জীবনধারণের মতো মজুরি।

৩. দুর্ভিক্ষের অবসান।

৪. কৃষকদের ঋণ মুকুব , সুলভ সরকারি ঋণ ও সেচের ব্যবস্থা।

৫. বেকার সমস্যার সমাধান।

৬. নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস; কঠোর হস্তে দুর্নীতি ও চোরাবাজার দমন।

৭. পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক শিল্পায়ন।

৮. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে বিনামূল্যে কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের জন্য জমি।

৯. কমনওয়েলথ বন্ধন ছিন্ন করে ব্রিটিশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।

১০. সোভিয়েত চীন প্রভৃতি দেশ সহ সকলের সঙ্গে সমানাধিকারের ভিত্তিতে বাণিজ্য সম্পর্ক, ইত্যাদি।

১৯৫১ সালে স্বাধীনতা পত্রিকার ৮ ডিসেম্বর এর সংখ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির এই ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়েছিল। তখন ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিআই। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিধানসভায় ৭১ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কমিউনিস্ট পার্টি ২৮ টি আসন লাভ করেছিল। লোকসভায় ৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দখল করেছিল পাঁচটি আসন। সে সময়ে সরকার যখন ধরে নিয়েছিল যে দমন-পীড়ন চালিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি কে খতম করে দিয়েছে, তখন পার্টির এই সাফল্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। ১৯৪৮ – ৫০ সাল নাগাদ কিছু ভুল করলেও জনগণ যে কমিউনিস্ট পার্টিকে পরিত্যাগ করেননি তারা যে বরাবর জনগণের সঙ্গে ছিলেন এই নির্বাচনী ফলাফলে সেটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

জ্যোতি বসু তখন থেকেই পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা।
পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। বাবা পেশায় ডাক্তার, মা তালুকদার পরিবারের মেয়ে। পরিবারে সরাসরি কেউ রাজনীতির সাথে যুক্ত না হলেও সে সময় বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার পুরানো রেওয়াজ ছিল। হাজার 931 সাল নাগাদ শহীদ মিনারে সুভাষচন্দ্র বসুর সভায় নিজের আরেক ভাইয়ের হাত ধরে হাজির হয়েছিলেন। সেই সভায় পুলিশ লাঠি চালায়। দুবাই সেই লাঠির ঘায়ে আহত হন। কিন্তু দুজনে একসাথে সিদ্ধান্ত নেন ভয় পাবেন না, ভয় পেয়ে চলে যাবেন না। তার নিজের স্মৃতিকথায় এই ঘটনা দেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ। প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স সহ বিএ পাস করেন। এরপরে লন্ডনে যান ব্যারিস্টারি পড়তে। তার লন্ডন যাওয়ার এক বছর পরে ভূপেশ গুপ্ত লন্ডনে পড়াশোনা করতে গেছিলেন। এই সময় লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠে লন্ডন মজলিস। জ্যোতি বসু তাঁর প্রথম সম্পাদক। এই সংগঠনের কাজ ছিল ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে মত গঠন করা এবং চাঁদা সংগ্রহ। ওই একই সময়ে পুনর্গঠিত হয় ব্রিটেনে ভারতীয় ছাত্রদের ফেডারেশন। তারই মুখপত্র “ভারতীয় ছাত্র ও সমাজতন্ত্র” প্রকাশ পেতে থাকে। লন্ডন কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্রদের কমিউনিস্ট গ্রুপ এই সময়ে গঠিত হয়। ইন্ডিয়া লীগের নেতা কৃষ্ণ মেনন জহরলাল নেহেরুর সঙ্গে জ্যোতি বসুর প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। দেখা হবার পর তিনি নেহেরুকে বলেন ‘আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী’ । নেহেরু এর উত্তরে বলেন ‘আমাদের সামনে এখন প্রধান কাজ ভারতের জন্য স্বাধীনতা অর্জন। এ বিষয়ে তোমরা আমার সঙ্গে একমত কি?’ তিনি জানান ‘আমরা একমত’ ।

সে সময় লন্ডনে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন কিংবা পার্টির সদস্য এরকম বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির সাথে তার পরিচয় ঘটে। যেমন প্রমোদ সেনগুপ্ত ডক্টর শশধর সিনহা। ভারত থেকে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃটেনের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ভারত সম্পর্কে একটি থিসিস পাঠিয়েছিলেন। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ ভারতীয় ছাত্রদের অভিমত জানার জন্য ওই থিসিস তাদের কাছে পাঠান। লন্ডনে বাসরত কমিউনিস্ট ছাত্ররা সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের থিসিস গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিমত জানান, ব্রিটিশ পার্টি সেই অভিমত গ্রহণ করে। লন্ডনে থাকাকালীন সেখানকার রাজনীতি সম্পর্কে জ্যোতি বসুর কিছু নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা হয়। সেই অভিজ্ঞতা আজও আমাদের সবার মনে রাখা প্রয়োজন। বৃটেনের চেম্বারলেন সরকার ধরেই নিয়েছিল হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নকেই প্রথম আক্রমণ করবে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির মধ্যেই লড়াই হবে এবং ব্রিটেন অক্ষত থেকে যাবে। চেম্বারলেন সরকার হিটলারকে নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নকেই প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করতো। তাই বৃটেনের কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। চেম্বারলেন এর বদলে চার্চিল প্রধানমন্ত্রী হবার পরেই বৃটেনের প্রতিরক্ষা অসামরিক ব্যবস্থা সাজানো হয়। যদিও চার্চিল ছিলেন নামকরা কমিউনিস্ট বিরোধী তবু তিনি নাৎসি জার্মানি কে প্রতিরোধ করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করেন।

ইতিমধ্যে তার ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফেরার সময় হয়ে যায়। ততদিনে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশে ফিরে ব্যারিস্টারি করবেন না, কমিউনিস্ট পার্টিতে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে যোগ দেবেন। ফেরার সময় বৃটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা ভারতীয় ছাত্রদের ওয়াচ করছে বলে তাদের সন্দেহ হয়। তাদের সাথে অনেক গুলি বই’র মধ্যে ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস’ এই বইটিও ছিল। জ্যোতি বসুর সন্দেহ ছিল এই বই ব্রিটিশ পুলিশ ভারতে নামা মাত্রই বাজেয়াপ্ত করবে। তিনি তার সাথে জাহাজে সহযাত্রী হিসেবে থাকা এক মহিলাকে সেই বইটির রাখতে দেন এবং বাকি বইগুলি নিজের সাথে রাখেন। জাহাজ বোম্বাইতে নামা মাত্রই গোয়েন্দারা খানাতল্লাশি করে অন্য বইগুলি আটক করে তবে ওই মহিলার সঙ্গে থাকায় সি পি এস ইউ’র ইতিহাস বইটি রক্ষা পায়।

জ্যোতি বসু ভারতে ফিরে সেই সময়কার পার্টির নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেন। ব্যারিস্টার হিসাবে কলকাতা হাইকোর্টে নাম লিখিয়েছিলেন কিন্তু কোনদিন প্র্যাকটিস করেন নি। ফ্যাসিবাদী জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে পার্টির মধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়, জেলবন্দি নেতৃবৃন্দ পাখির কমরেড দের কাছে অভিমত পাঠান যুদ্ধে চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে অতএব পার্টির রণকৌশলের পরিবর্তন প্রয়োজন। জেলের বাইরে থাকা কমরেডরা ও মনে করতেন এটা আর সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নয় জনযুদ্ধ। এই সময়ই পার্টির একটি মঞ্চ হিসেবে সোভিয়েত সুহৃদ কমিটি এবং ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়। জ্যোতি বসু সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির প্রথম সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৪ সাল নাগাদ পার্টির নেতারা জ্যোতি বসুকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার জন্য পাঠান। প্রথমে তিনি বন্দর শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন। সময় বন্দর শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্টের বিশেষ কোনো সংগঠন ছিল না। এই সময়ে বিএন রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন করে তুলতে চেষ্টা করে পার্টি। এই কাজে জ্যোতি বসু কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার সাথে সেই কাজে ছিলেন মহম্মদ ইসমাইল এবং নিখিল মৈত্র।

সেই সময় রেলে ইউনিয়ন গড়ে তোলার কাজ ছিল বেশ কঠিন। আগে থেকেই একটি প্রতিষ্ঠিত সংগঠন সেখানে কাজ করতো তার নাম বিএন রেলওয়ে এম্প্লয়িস অ্যাসোসিয়েশন হুমায়ুন কবীর পরে এই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হন। শেষ পর্যন্ত বিয়ের রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন গড়ে তোলা হয়, সময়টা ১৯৪৪ সাল এই সংগঠনের সভাপতি হন বঙ্কিম মুখার্জি এবং সাধারণ সম্পাদক হন জ্যোতি বসু। রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্টদের সংগঠন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রশ্নেই শ্রমিকদের সংগঠিত করেনি, শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তুলতেও কাজ করেছে। তারই ফলে নৌ বিদ্রোহের সময় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে রেল শ্রমিকদের ২৪ ঘণ্টার রেল ধর্মঘট এক নজির হিসেবে হয়েছিল।

এরপরে পশ্চিমবঙ্গের আইনসভায় এমএলএ হিসেবে জ্যোতি বসুর নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে হুমায়ুন কবীর জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। অনেক চেষ্টা হয়েছিল ভোট লুট কারচুপি করে ভোটে জেতার। কিন্তু কমিউনিস্ট কর্মীদের আনুগত্য এবং ক্লান্তিহীন পরিশ্রম তাদের পথ নিশ্চিত করে। হুমায়ুন কবীর কে পরাজিত করে জ্যোতি বসুর নির্বাচিত হন। ওই একই নির্বাচনে রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং রূপনারায়ন রায় এমএলএ হয়েছিলেন।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। এই দিনে শুরু হয়েছিল ভাতৃঘাতী দাঙ্গা। সেসময় স্টেটসম্যান পত্রিকা এই ঘটনাকে গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং আখ্যা দিয়েছিল। হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িকতাবাদী গোষ্ঠীগুলি দাঙ্গা শুরু করে। কিন্তু এই দাঙ্গার প্রধান উস্কানিদাতা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ঠিক করে ফেলেছিল যে তারা ভারতকে বিভক্ত করে পৃথকভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে আর দেশকে বিভক্ত করার পক্ষে যুক্তি জোরদার করার জন্য দাঙ্গা বাধিয়ে দিতে হবে। সেসময় কমিউনিস্ট পার্টি দেশবিভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিল এবং নিজস্ব সীমিত শক্তি নিয়েও কংগ্রেস লীগ ঐক্য হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য লাগাতার অভিযান চালিয়ে ছিল। মুসলিম লীগ ১৬ আগস্ট কে সারাদেশে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। বাংলা সরকার ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করল। এই নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত সরকার প্রত্যাহার করে নিক। কারণ এই ছুটি ঘোষণা সাম্প্রদায়িক শক্তি গুলি সম্প্রীতির পরিবেশ দূষিত করায়ে উস্কানি যোগাবে হিন্দু মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রীতি মধ্যে বসবাস করতে চান। তথাকথিত প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের কোন প্রয়োজন নেই।

জ্যোতি বসু ১২ অগাস্ট বিধানসভায় এই কথাগুলো বলার সুযোগ পাননি কারণ তাকে কোনো কথা বলার সুযোগই দেওয়া হয় নি। কয়েকদিন পরেই দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। কলকাতার রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেল। সে সময় পার্টি কমিউন গুলিতে অনেক পার্টির নেতৃত্ব আটকে পড়ে ছিলেন। বঙ্কিম মুখার্জি নিরদ চক্রবর্তী এবং সস্ত্রীক আব্দুল মমিন চিত্তরঞ্জন এভিনিউ তে ইসলামিয়া হাসপাতাল এর পাশের একটি বাড়ীতে আটকে ছিলেন। জ্যোতি বসুর স্নেহাংশু আচার্য এবং মহম্মদ ইসমাইল কে সাথে নিয়ে তাদের উদ্ধার করে পার্টির দফতরে নিয়ে আসেন। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল এই উদ্ধারকার্যে কিছুমাত্র দেরি হলে তাদের প্রত্যেকের জীবন বিপন্ন হতো।

কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও একটা নির্দিষ্ট দিকের কথার উল্লেখ জরুরী। জ্যোতি বসু নিজের জীবনী তে সে কথার উল্লেখ করেছেন এবং যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই করেছেন। হিন্দু অধ্যুষিত অনেক এলাকায় এমন সব ব্যক্তি ছিলেন যারা ওই উন্মত্ততার মধ্যেও নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছেন। আবার অনেক মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাতেও এমনসব ব্যক্তি ছিলেন যারা অনুরূপভাবে বহু হিন্দু পরিবারকে রক্ষা করেছেন আশ্রয় দিয়েছেন এবং এলাকা থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন তৎকালীন পার্টিনেতা কৃষ্ণ বিনোদ রায় তখন পার্ক সার্কাসে একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ওই বাড়ির মালিক ছিলেন একজন মুসলমান। তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে কৃষ্ণ বিনোদ রায় কে এই ফ্ল্যাট থেকে বের করে থানায় পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৬ আগস্ট দাঙ্গা শুরু হবার পর পাঠিয়ে নেতৃত্ব একটি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গড়ার কথা ভাবছিলেন। যখন ১৯৪৭ সালে গান্ধীজী বেলেঘাটায় ক্যাম্প করে আছেন তখন তার সঙ্গে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিগণ অবিরাম দেখা করছেন। পার্টির নির্দেশে ভূপেশ গুপ্ত কে সঙ্গে নিয়ে তিনিও গান্ধীজীর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন এবং এই সর্বদলীয় কমিটি গড়ার প্রশ্নে তার পরামর্শ চান। গান্ধীজী বলেন একটি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠন এবং একটি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় মিছিল সংঘটিত করাই হবে এই মুহূর্তে প্রধান কাজ। কমিউনিস্ট নেতৃত্বরা সর্বদলীয় শান্তি কমিটি গঠনের কাজে নামেন। সুরাবর্দী সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতাদের এক বৈঠকে বসানোর ব্যবস্থা হয়। পার্টির পক্ষ থেকে জ্যোতি বসু এবং ভূপেশ গুপ্ত সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি হিসাবে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দী সেই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সর্বদলীয় শান্তি কমিটি গঠন এবং শান্তি মিছিলের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার সময় সুরাবর্দী জ্যোতি বসু এবং ভূপেশ গুপ্তকে তার শোবার ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে গোপনে বলেন শ্যামাপ্রসাদ বাবু কমিউনিস্টদের সঙ্গে একই কমিটিতে কাজ করতে রাজি নন।

দেশ ভাগের মধ্যে দিয়ে দেশে স্বাধীনতা আসে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা এ দেশের গরীব মেহনতী মানুষের সমস্যার এতোটুকু সমাধান হয় না। অবিভক্ত বাংলাদেশ কৃষক আন্দোলনের একটা গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪০ সালে নিযুক্ত ভূমি রাজস্ব কমিশনের হিসাব অনুযায়ী সে সময়ে কৃষকদের শতকরা ৪১ জন ছিলেন বর্গাদার- আধিয়ার। সেই ভূমি রাজস্ব কমিশন তেভাগার দাবির ন্যায্যতা স্বীকার করেছিল। কমিশনের সুপারিশ তৎকালীন মন্ত্রিসভা গ্রহণ করে বর্গাদার উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিকে বিধিবদ্ধ রূপদানের জন্য একটি খসড়া বিল রচনা ও প্রচার করেছিল। কিন্তু চিরতরের জন্য ধামাচাপা দেওয়া হয় বিলটিকে। এই প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু সুরাবর্দী কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে সুরাবর্দী বলেন ‘আমি জানতাম না যে আমার দলে এত জোতদার রয়েছে’।

দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত কলকাতার মহম্মদ আলী পার্কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেস থেকেই পিসি যোশীর বদলে পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন বি টি রণদিভে। এই কংগ্রেস থেকে পার্টির রণকৌশল সম্পর্কে যা সিদ্ধান্ত হয় তাতে দেশের সরকার কমিউনিস্ট পার্টির উপরে ব্যাপক গ্রেফতার, অত্যাচার-নিপীড়ন নামিয়ে আনে।

পার্টির অনেক নেতাদের মত জ্যোতি বসুকেও গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে যে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল সেগুলি দেখে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন “এগুলি যদি যুক্তিসংগত কারণ হয় তাহলে আমি ধরে নিতে পারি আপনারা সরকারের উদ্দেশ্যে যে কোন সময়ে ভারতের যেকোনো স্থানে যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও আটক করতে পারেন”, তিনি আরো যুক্ত করেন “সরকারের নিরাপত্তাই যদি একমাত্র বিষয় হয় তাহলে নির্বাচনে কেউই সরকারের বিরোধিতা করতে পারবেন না বিরোধিতা করলেই বিনা বিচারে আটক করা হবে এবং আটক ব্যক্তিরা বিচারালয় থেকে কোন সাহায্যই পাবেন না”।

সে সময়ে এ ধরনের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত কারণ ব্যাখ্যার জন্য কলকাতা হাইকোর্ট একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছিল, আর তাতে আতঙ্কিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার রাতারাতি পশ্চিমবঙ্গ নিরাপত্তা আইন সংশোধনের জন্য একটি অর্ডিন্যান্স জারি করে। সেই অর্ডিন্যান্সের স্যার কথাটি ছিল সরকার যে কারণ দেখাবে সেটাই হবে যুক্তিসংগত কারণ। নবগঠিত বিশেষ বেঞ্চ যেদিন তাদের রায় দেবেন সেদিনই অর্ডিন্যান্সটি জারি করা হয়। বিশেষ বেঞ্চের একজন অন্যতম বিচারপতি এক পৃথক রায় দেবার সময় মন্তব্য করেন “যে কর্তৃপক্ষ অর্ডিন্যান্স রচনা করেছেন তাদের উচিত ছিল বিচারালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা”।

এসব থেকে স্পষ্ট কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ভয় পেয়ে সেদিনের কংগ্রেস সরকার সর্বোতোভাবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছিল। সে সময় ভারতে কমিউনিস্ট রাজনীতি বামপন্থী সংকীর্ণতা যদি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছিল।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের চতুর্থ সপ্তাহে কমিনফর্ম মুখপত্রের দেশে-দেশে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের উপর একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশ গুলির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অগ্রগতির মূল্যায়নের পর ভারতে কমিউনিস্টদের কি কাজ হওয়া উচিত সে বিষয়ে সেই প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল ভারতে কমিউনিস্টরা যে সংকীর্ণতা বাদী রাস্তা নিয়েছে তা ভুল এবং তার সংশোধন করতে হবে। কমিনফর্ম এর মুখপত্রের এই সম্পাদকীয় মন্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পরই পার্টির তৎকালীন পলিটব্যুরো এক সার্কুলার প্রচার করে জানায় ওই সম্পাদকীয় মন্তব্যের ভিত্তিতে পার্টির অনুসৃত রণকৌশলের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা হবে। এই মুখপত্রের নাম ছিল ফর এ লাস্টিং পিস, ফর এ পিপলস ডেমোক্রেসি।

এর কিছুদিন বাদেই পার্টির পলিটব্যুরো পুনর্গঠিত হয় এবং অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসাবে রাজেশ্বর রাও পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। পার্টির মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলে, বিতর্ক হয়। রাজনৈতিক রণকৌশল সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের পার্টি কমরেড দের সাথে অন্যান্যদের মত পার্থক্য ছিল। তখনকার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চেয়ে ছিলেন পার্টি থিসিসের ওপর জোর দিতে, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের কমরেডরা আগে পার্টির নেতৃত্বে পুনর্গঠন এর দাবি করেন থিসিস সম্পর্কে আলোচনা পরবর্তীকালে করা যাবে বলে মত প্রকাশ করেন। এই আন্ত পার্টি সংগ্রামের সময় আত্মগোপনকারী নেতাদের একের পর এক গ্রেফতার হতে হয় জ্যোতি বসু এই সময় গ্রেপ্তার হন। একইসাথে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত, আব্দুল হালিম, আবদুল্লাহ রসুল, ভূপেশ গুপ্ত, সরোজ মুখার্জি এবং অন্যান্য কয়েকজন।

এই পর্বে জ্যোতি বসুর প্রায় এক বছর জেলে বন্দি অবস্থায় কাটে। পরে হেবিয়াস কর্পাস এ আবেদন করার ফলে ১৯৫১ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এর পরেই আসে ১৯৫২ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন।

সেই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশিত দাবি সনদ এই লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্বাচন পরবর্তীতে পার্টির মধ্যে কাজের পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায় পার্টির সাফল্য প্রধানত শহর ও শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল গ্রামাঞ্চলের পার্টির অবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রাদেশিক কমিটি কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। গ্রাম ও শহরে গণ-আন্দোলন ও গণসংগঠনগুলি শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, নির্বাচনী সাফল্যকে সংহত ও সম্প্রসারিত করার উপর জোর দেওয়া হয়।

১৯৫২ সালের নির্বাচনের পর গঠিত নতুন বিধানসভায় বিরোধী সদস্যের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৭৬ জনসংখ্যা এবং হিন্দু মহাসভার মোট ৭ জন সদস্যকে বাদ দিয়েও বিরোধী পক্ষের শক্তি ছিল ৬৯। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে পূর্বতন আইনসভায় কার্যত কোনো বিরোধী পক্ষের অস্তিত্ব ছিল না। এই বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসাবে জ্যোতি বসু কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯৫৩ সালের মাদুরাই তে কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কংগ্রেস এর আগে পশ্চিমবঙ্গে প্রাদেশিক সম্মেলন হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির রাজনৈতিক সাংগঠনিক রিপোর্ট নিয়ে সেই সম্মেলনে দীর্ঘ আলোচনা হয়। পার্টির আশু কাজ সম্পর্কে প্রস্তাব গৃহীত হয়। নতুন প্রাদেশিক কমিটি নির্বাচিত হলে সেই কমিটিতে সরোজ মুখার্জি, নিরঞ্জন সেন, প্রমোদ দাশগুপ্ত, মুজাফফর আহমেদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ থাকেন। জ্যোতি বসু কে সর্বসম্মতিক্রমে প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে মাদুরাইতে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। মাদুরাই কংগ্রেস 39 জন সদস্যকে নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করে, সেই কমিটিতে জ্যোতি বসুও একজন ছিলেন। নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নিয়ে পলিটব্যুরো গঠন করে সেই পলিটব্যুরো তে ছিলেন অজয় ঘোষ, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ, এস এ ডাঙ্গে, পি রামমূর্তি, পি সুন্দরাইয়া, ডক্টর রণেন সেন, জেড এ আমেদ, শ্রী রাজেশ্বর রাও এবং হরকিসেন সিং সুরজিত।

সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৫৯ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে কার সম্পর্কে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয় তারই পরিণতি হিসেবে এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ও বন্ধু দেশের মধ্যে সীমানা সংঘর্ষ দেখা দেয় ১৯৬২ সালে। দেশের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি গুলি এবং কংগ্রেসের একাংশ উগ্র জাতীয়তাবাদী জিগির তোলে। দুর্ভাগ্যক্রমে তৎকালীন ডাঙ্গেপন্থীরা উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সুরে সুর মেলান। এরা সমগ্র দেশে যুদ্ধের উন্মাদনা সৃষ্টি করেন। চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ এর প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল এই বিরোধ আলোচনার মারফত শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে ফেলতে হবে। বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা চাই এই দাবিতে তৎকালীন প্রফুল্ল সেন সরকারের নিপীড়নমূলক কার্যকলাপ উপেক্ষা করেই সেদিনের কমিউনিস্ট পার্টি অভিযান চালায়, নিজেদের কথা প্রচার করে। তৎকালীন কংগ্রেস দল কমিউনিস্ট পার্টি কে দেশদ্রোহী আখ্যা দেয়। নানাভাবে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের উপরে এবং কমিউনিস্ট পার্টির দপ্তরে আক্রমণ করা হয়। ইতিমধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ আরো তীব্র হয়। চীনের নিরাপত্তা বাহিনী আসাম সীমানায় অবস্থিত বমডিলা পর্যন্ত এসে থেমে যায়। তারপর একতরফাভাবেই নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নিয়ে নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যায়। তৎকালীন ডাঙ্গে গোষ্ঠী স্বাধীনতা পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব কমরেড সরোজ মুখার্জির বদলে সোমনাথ লাহিড়ীর হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। পরে ব্যাপক ধরপাকড়ের সুযোগ নিয়ে তারা স্বাধীনতা পত্রিকা দখল করেন।

পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীদের একটা বড় অংশকেই ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেফতার করা হয়েছিল দেশদ্রোহীতার মিথ্যা অভিযোগে। প্রায় এক বছর আটক রাখার পর তাদের পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তাদের উপরে পুলিশের নজরদারি চলতে থাকে। এর পরবর্তীতে পার্টির বামপন্থী নেতৃত্ব তেনালি কনভেনশনের আয়োজন করেন এবং পার্টির সপ্তম কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় ৩১ শে অক্টোবর থেকে ৭ই নভেম্বর পার্টির নবম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেই কংগ্রেস থেকেই গঠিত হয় সিপিআইএম বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। ১৯৬৫ সালের মার্চ মাসে কেরলের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী প্রতীক প্রার্থীর স্বার্থে নবগঠিত পার্টির এমন নামকরণ করা হয়েছিল। এরপরে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পরিচালনায় সিপিআইএম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। জ্যোতি বসু দুই সরকারেরই উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন। ফার্স্ট পার্টি হিসাবে সিপিআইএম এগিয়ে থাকা সত্বেও যুক্তফ্রন্টের স্বার্থেই সিপিআইএম মুখ্যমন্ত্রীর পদের দাবি করে নি।

এরপরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং জনচেতনায় গুণগত পরিবর্তন আসে। কমিউনিস্ট এবং বামপন্থীদের প্রভাব ক্রমশ জনগণের মধ্যে বিস্তৃত হচ্ছিল। তাই এ দেশের শাসকগোষ্ঠীর নিজেদের শ্রেণি রাজনীতির চরিত্র অনুযায়ী জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নির্বাচনের নামে ভোট ভোট জালিয়াতি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কায়দা ব্যবহার করে ক্ষমতায় বসে। সিদ্ধার্থ শংকর রায় সে সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক অন্ধকার সময় নামিয়ে আনেন। আবার পার্টির মধ্যে নতুন করে সংকীর্ণতাবাদী বিচ্যুতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নকশালপন্থী নাম করে পার্টির একটি অংশ দল ভেঙে বাইরে বেরিয়ে যায়। সিপিআইএমকে এক দীর্ঘ সময় একদিকে নকশালপন্থীদের সাথে অন্যদিকে কংগ্রেসী গুণ্ডাবাহিনীর অত্যাচারের সাথে লড়াই করতে হয়েছে।

এই লড়াই সহজ ছিল না। একদিকে সেই লড়াই ছিল মতাদর্শগত আরেকদিকে মাটি ও জনগণকে রক্ষা করার এক বিরাট দায়িত্ব পার্টির উপরে এসে পড়েছিল। সিপিআইএম এই দুই লড়াই থেকেই এক কদম পিছিয়ে আসেনি। শেষ অবধি এই দুই লড়াইতে সিপিআইএম জয়ী হয়েছে। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। এই নির্বাচন কেবলমাত্র একটা নির্বাচনে জেতার প্রশ্ন ছিল না। তা ছিল এই রাজ্যের মানুষের মানবিকতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতাবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় রোধ করার প্রশ্ন। তা ছিল সংবিধান প্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার ও জীবনের প্রয়োজনীয় যে ন্যূনতম নিরাপত্তা বিগত সাত বছর ধরে এই রাজ্যে আক্রান্ত ও রক্তাক্ত, তা পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন। বহু মানুষ বাড়িছাড়া হয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের মন্ত্রিসভা ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে সন্ত্রাসের সাহায্যে মানুষের কণ্ঠরোধ করা যাবে।

কিন্তু সিদ্ধার্থ রায়ের মনে ছিল না শেষ কথা জনগনই বলেন।

এমনিতেই ৭২ সালে রেগিং করে জিতে আসা সিদ্ধার্থ রায়ের মন্ত্রিসভার মেয়াদ ফুরিয়ে ছিল। কিন্তু সংবিধানের ৭২ তম সংশোধনের সুযোগে লোকসভার সঙ্গে রাজ্য বিধানসভা গুলির মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ পাঁচ বছর থেকে ছয় বছর করে দেওয়া হয়েছিল। লোকসভা নির্বাচনে এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে জনগণ রায় দিয়েছিলেন। ফলে লোকসভা নির্বাচনের পর রাজ্য বিধানসভা গুলির নির্বাচন করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। নির্বাচন কমিশনের দ্বারা সিদ্ধান্ত হলো পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে দু’দফায় ১১ এবং ১৪ ই জুন।

এই বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনতা পার্টির সাথে জোট করা গেল না।

পরেরদিন বামপন্থী দলের বৈঠকের সমস্ত আসনে বামফ্রন্টের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেদিনের সেই সিদ্ধান্তের ফলে এরা যে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল।

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল। ১৮ জুন সকাল সাড়ে নটায় সিপিআইএমের রাজ্য দপ্তরে বামফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ একটি বৈঠকে মিলিত হন।

ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা অশোক ঘোষ বিধানসভায় বামফ্রন্টের পরিষদীয় দলের নেতা হিসাবে জ্যোতি বসুর নাম প্রস্তাব করেন, আর এস পি নেতা মাখন পাল সেই প্রস্তাব সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি সেই বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

এর পরেই সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে রাজ্যপাল এ এল ডায়াসের এর কাছে ফ্রন্টের শরিকদলগুলোর রাজ্য সম্পাদকরা চিঠি পাঠান।

১৯৭৭ সালের ২১ জুন রাজভবনে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার শপথ গ্রহণ করে।

প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন জ্যোতি বসু।

Spread the word

Leave a Reply