‘চিত্তের প্রসাদ’ – চিত্তপ্রসাদ ইন্দ্রজিৎ নারায়ণ

২১ জুন২০২২, (মঙ্গল বার)

কখনও কালো জমির ওপর সাদা রেখা, কখনো ঠিক তার উল্টোটা – সাদার ওপর কালো। কিন্তু সেই রেখা, সাদা হোক বা কালো – সূক্ষ্ম হোক বা বলিষ্ঠ, এক স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দময়তায় তারা চিত্ররূপ দিয়েছিল তাঁর ভাবনার। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, সেই তৃতীয় দশকে, যে ভাবনা ছিল ভীষণভাবেই ব্যতিক্রমী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। তার প্রভাবে ‘ব্রিটিশ ভারতে’ ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে বিদেশি শাসকের ঔপনিবেশিক নিপীড়ন আর তার অনুসারী হিসেবে জমিদার আর জোতদারদের অত্যাচার। এই যৌথ আগ্রাসনের শিকার সাধারণ দেশবাসী। যাঁরা অধিকাংশই কৃষক – শ্রমিক – চাকরিজীবী, কর্মচ্যূত বা কর্মহীন মধ্যম বা নিম্ন মধ্যবিত্ত। চারপাশে নিরন্ন মানুষের হাহাকার আর মৃত্যু মিছিল। এই মানুষগুলির যন্ত্রণাই ভিড় করত তাঁর মননে। আর যন্ত্রণার গর্ভ থেকেই ক্রমে গড়ে উঠছিল প্রতিরোধ। এই অসাম্য- নিপীড়ন আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সেই প্রতিরোধের অভিঘাত ঠিক করে দিচ্ছিল তৎকালীন পরাধীন ভারতে গড়ে ওঠা সাম্যবাদী তথা বামপন্থী আন্দোলনের অভিমুখ।


বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত, দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মানুষ যখন বাঁচার স্বপ্ন দেখতে দেখতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, তখন তা পরিণত হয় এক বিপুল বলিষ্ঠ প্রতিবাদে।
এই মানুষগুলির কাতর- ক্লিষ্ট- ক্ষুধার্ত অবয়ব প্রকাশ পেত তাঁর চিত্রভাষায় আর লেখায়। আর মানুষের প্রতিবাদের প্রকাশে, তাঁর ছবি ক্রমেই পরিণত হয় অসামান্য এক ঋজু, বলিষ্ঠ অভিব্যক্তিতে।


সেই সময়ে বাংলা থেকে সারা ভারতে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘Bengal School of Art’-এর ধ্রুপদী – দেশাত্মবোধক শৈলীর সমান্তরালে এমন প্রগতিশীল শৈলীর প্রতিষ্ঠা করা ছিল এক ভীষণ সাহসী পদক্ষেপ।ব্যতিক্রমীও বটে। আর তিনিই তা পেরেছিলেন। কারণ তিনি ‘চিত্তপ্রসাদ’। হিন্দু বর্ণাশ্রমের সংকীর্ণ উঁচুনিচুর ভেদাভেদ, ঘৃণার সাথে প্রত্যাখান করেছিলেন। তাই স্বাক্ষরে কখনই তাঁর পারিবারিক পদবী ‘ভট্টাচার্য’ ব্যবহার করেন নি। সব ক্ষেত্রেই ছিলেন বাঁধা ছকের বাইরে।
২১ জুন, ২০২২, তাঁর ১০৭ তম জন্মদিবস।
১৯১৫-এ উত্তর ২৪ পরগণার নৈহাটিতে জন্ম।

৩০-এর দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম সরকারি মহাবিদ্যালয়ে পড়াশুনা চলাকালিনই আকৃষ্ট হন প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি।সেই সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আর দেশীয় সামন্ত প্রভুদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দেলনে নিজেকে যুক্ত করেন। আর তাঁর প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন চিত্রকলা মাধ্যমকে।

ছাপাই ছবির মধ্যে লিনোকাট – উডকাট আর কালি কলমে তিনি সব চেয়ে বেশি কাজ করেছেন।
দুর্ভিক্ষ আর মন্বন্তরে জর্জরিত মানুষের ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে সাদা জমিতে তাঁর কালির রেখায়, কখনো বা কালো জমিতে লিনো আর উডকাটের বলিষ্ঠ রেখায়। গভীর সততায়, নির্মম বাস্তবকে তিনি যেন বন্দী করে রেখেছেন তাঁর নিজস্ব শৈলীতে, এক নিখুঁত দক্ষতায়।


সাদা কাগজের ওপর মূলত কালো রঙের বিভিন্ন ঘনত্বে স্বচ্ছ জলরঙের প্রলেপ, তার ওপর দ্রুত লয়ে কালো রঙে কলমে বা তুলিতে আঁকা মানুষ – কখনো খিদেয় কাতর, মরণাপন্ন, বাস্তুচ্যুত, কখনো প্রতিবাদে গর্জে ওঠা মিছিলে। আর ছিল ব্যঙ্গচিত্র – ব্রিটিশ শাসক বিরোধী নানান পোস্টারে। এর বেশিরভাগ কাজই ছিল প্রচারমূলক। সাধারণ মানুষের সামনে সাম্রাজ্রবাদ আর সামন্তবাদের কদর্য আগ্রাসী চেহারা তুলে ধরে, তার বিকল্প হিসেবে বামপন্থী আদর্শ সম্পর্কে সচেতন করা। এইসময় তিনি একের পর এক এমনই বহু প্রচারধর্মী ছবি এঁকেছেন। বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের জন্য। কখনো কখনো কিছু ছবিতে স্বাক্ষর করাও সম্ভব হত না – সময়ের অভাবে। এভাবেই ১৯৪৩-র মন্বন্তর নিয়ে তাঁর প্রথম ছবির series ‘Hungry Bengal’ প্রকাশ পায়। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনে প্ররোচিত করার অভিযোগ এনে, প্রকাশ পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ‘Hungry Bengal’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তার মূদ্রিত স়ংস্করণ বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। সেই উত্তাল সময়ে, স্বাধীনতাকামী বামমনস্ক জনমানসে তাঁর কাজ কতখানি প্রভাব ফেলেছিল, এই ঘটনা থেকেই তা অনুমান করা যায়।
এই সময়েই তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-র Logo এঁকে দেন, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
মানুষের স্বাভাবিক আবেগও এড়িয়ে যায়নি তাঁর দৃষ্টি ও মনন। তাই পুরুষ ও নারীর মানবিক সম্পর্ক এসে পড়েছে তাঁর সৃষ্টির সম্ভারে। লিনো বা উডকাটের যে বলিষ্ঠ রেখায় প্রতিবাদী মানুষ গর্জে উঠেছেন তাঁর কাজে – সেই রেখাই আবার অদ্ভুত এক পেলবতা নিয়ে গড়ে তুলেছে মানুষের সম্পর্কের বন্ধন। তাঁর পারিপার্শ্বিক নিসর্গও এসে পড়েছে তাঁর ছবির আঙিনায়। তবে অন্য উপকরণে – Dry আর Oil pastel, স্বচ্ছ বা অস্বচ্ছ জল রঙ, Gouache আর সংখ্যায় খুব অল্প হলেও, তেল রঙে।
১৯৪৬ থেকে তৎকালীন বোম্বাই শহরে তিনি স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেও নতুন ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনশীল কাজ চলতে থাকে।


৪০-এর দশকের শেষ ভাগে, কমিউনিস্ট পার্টির ভিতর গড়ে ওঠা মতাদর্শগত অর্ন্তদ্বন্দ্ব তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তাই পার্টির সাথে তাঁর প্রতক্ষ যোগাযোগ খানিকটা ক্ষিণ হয়। তিনি বিশ্বশান্তির সপক্ষে আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন। তার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত শিশু কিশোরদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার কর্মসূচিতে নিজেকে যুক্ত করে নেন।
কিন্তু তাঁর সৃজন প্রবাহে কখনো ভাঁটা পড়েনি।
বর্তমানে প্রাগের জাতীয় সংগ্রহশালা, নয়া দিল্লির National Gallery of Modern Art, DAG, মুম্বাইয়ের Osains Art Archive বা দুবাইয়ের Jane and Kito de Boer -এর সংগ্রহে তাঁর কাজ সংরক্ষিত।
১৩ নভেম্বর, ১৯৭৮-এ, কলকাতায় তিনি প্রয়াত হন।
আমৃত্যু অবিচল ছিলেন তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির সাম্যবাদী মতাদর্শে।


তাঁর অজস্র সৃষ্টি, যা একসময় তাঁর স্বাক্ষর ছাড়াই , সাম্যবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচারমূলক কাজেই শুধুমাত্র ব্যবহৃত হত….. আজ সম্ভ্রান্ত, সমঝদার সংগ্রাহকের কাছেও তা মহার্ঘ – তার নান্দনিকতা উত্তীর্ণ শিল্পগুণে। এভাবেই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মননেই বেঁচে থাকবে তাঁর সৃজন সম্ভার এব়়ং তাদের স্রষ্টা। কারণ তিনি ‘চিত্ত-র প্রসাদ’।

Spread the word

Leave a Reply