পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল সন্ত্রাসের প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনের সামনে ধরনা

May 23rd, 2019 [IST]

চোখে চোখ রেখে সোজা হয়ে কথা বলতে প্রয়োজনে একদিনের জন্য হলেও আমরা শিরদাঁড়া ধার দিতে পারি। শুক্রবার রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্পষ্ট এই প্রস্তাব রাখলেন সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। রাজ্যের সর্বত্র পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বকে ঘিরে শাসকদলের বেনজির সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে এদিন ১৭টি বামপন্থী ও বাম সহযোগী দলের অবস্থান বিক্ষোভ সংগঠিত হল রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে। এই কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে রাজ্য বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বললেন, রাজ্যের সর্বত্র আজ গণতন্ত্র আক্রান্ত। প্রয়োজনে একদিন নয়, বারবার এভাবেই অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচিতে আমাদের শামিল হতে হবে।

রাজ্যের ১৭টি বাম ও বাম সহযোগী দলের এমন যৌথ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরেই শুক্রবার দুপুর ২টোর ঢের আগে থাকতেই সরোজিনী নাইডু সরণিতে বাম কর্মী সমর্থকদের জমায়েত বড় হতে থাকে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দপ্তর সামলাতে পুলিশও তড়িঘড়ি ব্যারিকেড তৈরি করে কমিশনের অফিস সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাজ্যের নানা প্রান্তে মূলত বামপন্থী প্রার্থী এবং তার বাইরেও বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন আটকাতে যে বেনজির হিংস্র আক্রমণ, তাণ্ডব শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার হুঁশিয়ারি দিতেই ছিল এদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি। কোনও মঞ্চ ছাড়াই এই অবস্থান কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে এদিন সূর্য মিশ্র বললেন ভয় নেই, আমরা আপনার অফিস আক্রমণ করতে আসিনি। আমরা এখানে রান্নাবান্না করে মোচ্ছব করতেও আসিনি। আমরা শুধু জানতে এসেছি আপনি আপনার শিরদাঁড়াটা কোথায় বন্ধক রেখেছেন? শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে নয়, রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার, শাসকদলের উদ্দেশ্যে তিনি এদিন স্পষ্ট বলেছেন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমরা বামপন্থীরা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।

এদিন একটানা ৫ঘণ্টা ধরে চলা এই অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সূর্য মিশ্র বললেন, নির্বাচনে লড়াই বামপন্থীদের কাছে একমাত্র লড়াই নয়। বললেন, যদিও এই অবস্থান কর্মসূচিতে আগামী কাল থেকে ওদের হামলা, আক্রমণ থেমে যাবে না। কিন্তু যেখানে যে সমস্ত বামপন্থীরা, তার বাইরেও বিরোধীরা আক্রান্ত হচ্ছেন পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামিল হয়ে তাঁদের লড়াকু মানসিকতার পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার আমাদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচি। আমাদের কাছে বড় কথা এটাই যে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার লুট হচ্ছে নির্বিচারে। তাই রাজ্যের মানুষের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার অধিকার যখন আক্রান্ত হয় তখনই আমরা খোলা রাজপথে নামি। তিনি বললেন, অনেকেই বলছেন এই প্রহসনের পঞ্চায়েত নির্বাচন বয়কট করতে পারেন তো! কিন্তু রাজ্যের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থ নিয়েই আমাদের লড়াই। এই লড়াই থেকে বামপন্থীরা সরে গেলে আপনি বাঁচবেন তো?

শুক্রবার দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই অবস্থান বিক্ষোভের কর্মসূচিতে সূর্য মিশ্র এবং বিমান বসু ছাড়াও বক্তব্য রাখেন রাজ্য বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, সি পি আই-র স্বপন ব্যানার্জি, আর এস পি-র মনোজ ভট্টাচার্য, ফরওয়ার্ড ব্লকের নরেন চ্যাটার্জি, সি পি আই (এম এল) লিবারেশনের পার্থ ঘোষ, পি ডি এস-র মীর টিপু সুলতান, সি পি আই (এম)-র মিনতি ঘোষ প্রমুখ। অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাম নেতৃত্ব এদিন বললেন, এই মুহূর্তে গোটা রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে মনোনয়ন জমা দিতে পারাটাই একটা যুদ্ধ। গোটা রাজ্যের কোনও অংশেই আজ মানুষের নিরাপত্তা নেই। আজই দেশের অন্যতম সম্মানীয় প্রাক্তন বামপন্থী সাংসদ আক্রান্ত হয়েছেন। গতকালও একজন প্রাক্তন সি পি আই (এম)-র সাংসদ আক্রান্ত, রক্তাক্ত হয়েছেন।

বাস্তবে শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচনই যে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং তার নেত্রীর মূল আতঙ্ক তা ব্যাখ্যা করতে গিয়েই এদিন সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদক বিক্ষোভ অবস্থানে বললেন, ওরা জানে যদি শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচন সম্পন্ন হয় তবে ওদের মূল পর্যন্ত উপড়ে ফেলবেন রাজ্যের মানুষ। তাই নির্বাচন আসার ঢের আগে থাকতেই রাজ্যের সমস্ত বি ডি ও অফিস, নির্বাচনী আধিকারিকদের অফিস, নির্বাচন কমিশনের দপ্তর —সব দখল হয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমাদের কাছে খবর আছে কোথা থেকে ভাড়াটে গুন্ডা ঠিক করে অস্ত্রশস্ত্র মজুত করা হচ্ছে। ব্লক অফিসের সামনে প্রার্থীদের মনোনয়ন ঠেকাতে ওধার থেকে বোমা, গুলি ছোঁড়া হচ্ছে আর মাঝখানে পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাজ্যে শাসকদলের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট জানাচ্ছি হিম্মত থাকে তো মাঝখান থেকে পুলিশকে সরিয়ে নিন। তিনি বললেন, এই নির্বাচন কমিশনারকে বলে কিছু লাভ হবে না। পাঁচবছর আগেও একজন মহিলা নির্বাচন কমিশনার ছিলেন যিনি সাহস রাখতেন। রাজ্যের মানুষ দেখেছেন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে। শাসকদলের এমন চড়া বেনজির হিংস্র সন্ত্রাস সত্ত্বেও রাজ্যের নানা প্রান্তে প্রতিরোধের চিত্র কিছুটা তুলে ধরতেই এদিন মিশ্র বললেন, দুদিন আগে রায়গঞ্জ শহরটাই তৃণমূলী দুষ্কৃতীদের হাতে চলে গিয়েছিল। গুলি, বোমা ছুঁড়ে মানুষকে সন্ত্রস্ত করা হয়েছিল। আর আজ সেই রায়গঞ্জের বুকে প্রতিরোধের স্পর্ধা দেখাতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ জমায়েত করে দেখিয়ে দিয়েছেন।

এদিন রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে বেরিয়ে আসার পর বিমান বসু বলেছেন, শুধু ১৭টি বাম দলের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা নয়, রাজ্যের সমস্ত বিরোধীদের কন্ঠরোধ করা হচ্ছে সেই অভিযোগ নিয়েই আমরা গিয়েছিলাম। নির্বাচন কমিশনারের কাছে তুলে ধরা স্পষ্ট বক্তব্যগুলির মধ্যে রয়েছে আগামী ১লা মে রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন সম্পন্ন করা হচ্ছে যা নজিরবিহীন। বিশেষত সেই দিনটি শ্রমিক কর্মচারীদের কাছে একটি বিশেষ দিন। শুধু তাই নয়, ১লা মে সবে বরাত। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে এই দিনটির তাৎপর্য রয়েছে। ঐ বিশেষ দিনে আমরা নির্বাচন চাই না। শুধু তাই নয়, এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনেই এমন দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে যার নজির অতীত ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনটি দফাতেই নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্রের জমা দেওয়া ও তার স্ক্রুটিনির দিন একই। —এমন অদ্ভুতুরে আইন কেন? বিমান বসু বললেন, রাজ্য নির্বাচন কমিশন কি তবে শুধুমাত্র রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের হুকুম তামিল করার জন্য?

এরসঙ্গেই ১৭টি বাম ও বাম সহযোগী দলের প্রতিনিধিদল এদিন নির্বাচন কমিশনারের কাছে জানিয়েছে কিভাবে রাজ্যের প্রতিটি ব্লক অফিস শাসকদলের পেটোয়া দুষ্কৃতীদের ঘেরাটোপে রয়েছে। বিমান বসু বললেন, ব্লক অফিসগুলোর আশপাশে সমস্ত বিয়েবাড়ি, গেস্ট হাউস, হলঘর সবই শাসকদল ভাড়া নিয়ে মস্তান ঢুকিয়ে রেখেছে। আচমকা কোন নিয়মে ব্লক অফিসের সামনে বোমাবাজি হয়, বন্দুক চলে? নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তৎপর হতে হবে। অন্যথায় পদে থেকে নির্বাচন কমিশনারের লাভ কী? যথারীতি বাম দলগুলির এমন অভিযোগের জবাবে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার এদিন জানিয়েছেন আগামীকাল সমস্ত অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা হবে এবং সেইমতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এদিন সাংবাদিকদের কাছে বিমান বসু বলেছেন আজ নয়, ২০১১সালের পর থেকেই রাজ্যে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া চলছে। কিন্তু এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন অতীতের সমস্ত নজিরকে ছাপিয়ে গেছে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পথেই দেখা যাচ্ছে রাস্তায় ‘উন্নয়ন’ খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বসু বললেন, আজই কলকাতা হাইকোর্টে একটা নির্বাচনী মামলায় রায় বেরিয়েছে। তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে প্রার্থীপদ জমা দেওয়ার পথে যদি বাধা দেওয়া হয় তাহলে পুলিশকে সাহায্য করতে হবে। পুলিশকে প্রার্থীপদ জমা দেওয়া সুনিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্রে এটাই নিয়ম। তিনি বলেন, রাজ্যে এমনিতেই স্বৈরাচারী শাসন চলছে। এখন যেপথে চলছে তাতে গণতন্ত্রের সমাধি তৈরি শুরু হয়েছে।

এদিন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকের কাছে ডেপুটেশান দিতে যান বিমান বসুর নেতৃত্বে ১৫জনের এক প্রতিনিধিদল। এই প্রতিনিধিদলে বিমান বসু ছাড়াও ছিলেন সি পি আই (এম)-র রবীন দেব, সি পি আই-র স্বপন ব্যানার্জি, ফরওয়ার্ড ব্লকের হাফিজ আলম সইরানি, সি পি আই (এম এল) লিবারেশনের কার্তিক পাল, আর এস পি-র সুকুমার ঘোষ, আর সি পি আই-র সঞ্জয় বসু, ওয়ার্কার্স পার্টির শৈবাল চ্যাটার্জি, সি পি আই এম এল (সন্তোষ রানা)-র ইন্দ্র দস্তিদার, পি ডি এস-র অনুরাধা দেব, সি আর এল আই-র প্রবীর নিয়োগী, মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের জয়হিন্দ সিং, জে ডি ইউ-র সোমা নন্দী, এন সি পি-র কে কে শর্মা। এছাড়াও আরও যে ৪টি বামপন্থী দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল এদিনের অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তারা হল বি বি সি, বলশেভিক পার্টি, আর জে ডি এবং সি পি বি।