৩৭০ ধারা ও কাশ্মীরের ভূমি সংস্কার

August 22nd, 2019 [IST]

এই দেশে  জম্মু-কাশ্মীরই  প্রথম রাজ্য যেখানে ভূমি সংস্কার হয়েছে। জম্মু- কাশ্মীরের ভূমি সংস্কারের দুটো মূল উপাদান। এক, মহারাজার আমলের অনুপস্থিত জমিদারি ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। নিজে গ্রাম ছেড়ে বাইরে গিয়ে থাকেন এবং মধ্যসত্বভোগীদের দিয়ে গ্রামে জমিদারি শোষণ চালান এমন অনুপস্থিত জমিদারের জমি কোনোরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই দখল নিয়ে জমির ভাগচাষীদের মধ্যে বিতরণ করা৷ আর যে চাষি যত অংশের জমিতে চাষ করতো, তাকে বিনামূল্যে সেই জমির মালিকানা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, জমির মালিকানার উচ্চসীমা নির্দিষ্ট হলো 22 ¾ একর। কোনো ঘরে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ থাকলেই তারা এর বেশি জমি রাখতে পারবে না। এই উর্দ্ধসীমার বাইরে সমস্ত জমিই সরকার দখল নেবে ও গরীব ভাগচাষি বা বাস্তুহারা মানুষের মধ্যে বিতরণ করবে, বিনামূল্যে।

 

এই ভূমি সংস্কার আইনের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। 

এই আইনের চরিত্র অনুসারে, ছোট ভাগচাষিরা তুলনায় কম লাভবান হল। যেহেতু তারা অনুপস্থিত জমিদারের ছোট মাপের জমিতে চাষ করতো ফলে এস্টেটের থেকেও ছোট মাপের জমির মালিকানাই পেলো। ভবমিহীনরা ভূমি সংস্কারের খুব বেশি উপকার পায়নি। যেটুকু উর্দ্ধসীমা বহির্ভূত জমি ছিল, সেটাই তাদের হাতে এলো। এই জমি যথেষ্টই নিম্নমানের ছিল, আর জমি ছিল ক্ষুদ্র। এর কারণ, উর্দ্ধসীমা সংক্রান্ত ভূমি আইন বাস্তবায়িত করার দায়িত্বভার এখানে (বিপ্লবী চীনের মতন) কোনো কৃষক কমিটির হাতে যায়নি, গেছিলো রাজ্যের আমলাতন্ত্রের দখলে। যদিও এই ভূমি সংস্কারের ফসল কৃষিজীবীদের মধ্যে সমান ভাবে পৌঁছায়নি, তবুও এই আইন জুম্মু-কাশ্মীরে সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি ব্যবস্থা ভাঙতে সক্ষম হয়। আর এই ঘটনা 1950 সালের গোড়ার দিকের; The Big Landed Estates Abolition Act নামের আইনটা 1950 সালেই লাগু হয়েছিল৷ দেশের অন্য যেকোনো জায়গার আগে (কেরলে ভূমি সংস্কার হয় কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর 1957 সালে) জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যই যে প্রথম দৃঢ়ভাবে ভূমি সংস্কার করতে পেরেছিল তার পিছনে একটি মূল কারণ ছিল সংবিধানের 370 ধারা; সংসদে দাঁড়িয়ে যেটাকে আজ অমিত শাহ ওই রাজ্যের "উন্নয়নে" প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করছেন৷ এটাই পরিহাস!

 

জম্মু-কাশ্মীরের সংবিধানে না থাকলেও ভারতের সংবিধানে 'সম্পত্তির অধিকার' মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত৷ ভূমি সংস্কার আইনটি এই মৌলিক অধিকার (সম্পত্তির অধিকার)-এর বিরোধী — এই যুক্তিতেই উত্তর প্রদেশ, বিহার, তামিলনাড়ুর মতোন রাজ্যে ভূমি সংস্কার আইনের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করা হয়৷ এবং হাই কোর্টের জমি মালিকদের পক্ষেই রায় দেয়, আর মামলা গড়িয়ে যায় সুপ্রিম কোর্টে। এই সময়, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগেই জওহরলাল নেহরুর সরকার প্রারম্ভিকভাবে  সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়ে আসে, যার মাধ্যমে ওই সমস্ত আইন ওই তিনটি রাজ্যে বিচারব্যবস্থার পর্যালোচনার উর্দ্ধে রাখা হয়, আর সংবিধানের নবম অনুসূচিরও প্রণয়ন করা হয়। এই নবম অনুসূচির অধীন সমস্ত আইনকেই বিচারব্যবস্থার পর্যালোচনার বাইরে রাখা হল।

 

এখানেই ঘটনার শেষ নয়। একটা অন্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট 1954 সালে রায় দিলো যে  রাষ্ট্র যদি কোনো ব্যক্তির জমি অধিগ্রহণ করে তাহলে মালিককে সেই জমির বাজার দরে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে৷ অর্থাৎ ভূমি সংস্কার আইন অনুযায়ী অধিগৃহীত জমিরও বাজার দরে ক্ষতিপূরণ দেবে সরকার। এতে যেহেতু সরকারি রাজস্বে বিশাল পরিমানে চাপ পড়লো, নেহেরু সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাজ্যকে ভূমি সংস্কার আইনে অধিগৃহীত জমির পূর্ণ বাজার মূল্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে ছাড় দিল। এই সংশোধনীকেও নবম অনুসূচির অন্তর্গত করা হল, যাতে এটি আইনের বিচার্যের বাইরে থাকে।

 

এই আইনি টানাপোড়েনের মাঝে জম্মু-কাশ্মীরে সরকার ভূমি সংস্কার আইনের আওতায় বিনামূল্যে জমি অধিগ্রহণ করতে পারলো না, বাজার মূল্য না হলেও জমির মালিককে সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দিতেই হল। ফলতঃ এই জমি ভাগচাষীদেরও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া গেলো না। ভারতের বাকি রাজ্যে ভাগচাষীদের অধিকার ছিল, তারা চাইলে তাদের ভাগচাষের জমি কিনে নিতে পারে বা

ভাগচাষি হিসেবে কৃষিকার্য চালিয়ে যেতে পারে শুধু এই ক্ষেত্রে তারা সরকারের জমিতে চাষ করবে, কারণ সরকার এই জমি অধিগ্রহণ করে নিয়েছে জমিদারের থেকে। জম্মু-কাশ্মীরের সরকার চাইলেই বিনামূল্যে এই জমি দখল নিতে পারতো, বিনামূল্যেই বিতরণ করতে পারতো৷ কারণ তাদের নিজস্ব সংবিধানের স্বাধিকার নিশ্চিত ছিল, 370 ধারার দৌলতে। এই 370 ধারাই মৌলিক অধিকারের নামে ভূমি সংস্কার আইনকে বিচার ব্যবস্থার হাতের বাইরে যাওয়ার থেকে আটকে দেয়।

 

অতয়েব জম্মু-কাশ্মীরের ভূমি সংস্কার আইন সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় ভাবে মুছে ফেলতে দেশের অন্য রাজ্যগুলির থেকে অনেক বেশি সক্ষম হয়েছে। এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে জম্মু-কাশ্মীর ভারতে ভূমি সংস্কারের পথিকৃৎ ছিল, যতদিন না বিভিন্ন রাজ্যে বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসে এই দীর্ঘ উপেক্ষিত ভূমি সংস্কারের কাজে হাত দেয়।

 

সামাজিক গঠন ও জমি বন্টন ছাড়াও এই ভূমি সংস্কারের কারণেই জম্মু-কাশ্মীরে আয়ের অসাম্য অনেকটা রোধ করা গেছিলো। এর সাথেই গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্যও অনেকাংশে কমানো গেছিলো। Planning Commission-এর দারিদ্র সংক্রান্ত সরকারি গণনা অনুযায়ী, 2009-10 সালে সমস্ত রাজ্যের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা গ্রামীণ মানুষের অনুপাত সবচেয়ে কম। সে রাজ্যে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ছিল 8.1%, যা কেবল দিল্লির (7.7%)-এর থেকে সামান্য বেশি৷ আর সারা দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল 33.8%! তবুও যেহেতু দিল্লী একটা বিশাল শহর, সেখানকার পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ এলাকা কোনোভাবেই সমগ্র ভারতের গ্রামীণ এলাকার সমতুল্য নয়৷ সুতরাং সর্বনিম্ন গ্রামীণ দারিদ্র্যের শিরোপা জম্মু-কাশ্মীরেরই পাওনা। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতোন বিষয় হল ওই একই সময়ে সরকারি হিসেবে মোদী-অমিত শাহের গুজরাটে গ্রামীণ দারিদ্রের হার ছিল  26.7%! জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সেখাকার উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করার আগে, অমিত শাহের এই সরকারি হিসেবেগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে জেনে নেওয়া উচিত ছিল!

 

দারিদ্র্য সংক্রান্ত সরকারি হিসেবে বরাবরই প্রকৃত দারিদ্র্যকে কমিয়ে দেখানো হয়৷ কিন্তু যদি আমরা গ্রামীণ জনসংখ্যার কতজন ব্যক্তি প্রতিদিন নূন্যতম ২২০০ ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারে তার ভিত্তিতে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হিসেব নিতে যাই, তাহলেও রাজ্যগুলোর আপেক্ষিক অবস্থা প্রায় একই থাকে। গোটা দেশে যে রাজ্যগুলিতে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার সর্বনিম্ন, তাদের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর অন্যতম৷

 

দারিদ্র্যের হার নির্ণয় করে যে বাস্তবটা সামনে আসে, নানান ধরণের সামাজিক সূচকেও সেটাই ধরা পরে৷ জম্মু-কাশ্মীর সব দিক দিয়েই  সারা ভারতের মধ্যে অন্যতম সেরা রাজ্য।  এর কৃতিত্ব অবশ্যই ভূমি সংস্কারের যা বাস্তবায়িত হয়েছে সেখানে এবং যার অস্তিত্ব রক্ষা করেছে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার অন্তর্ভুক্তি।

 

জম্মু-কাশ্মীরে সর্বদাই বাকি রাজ্যের তুলনায় দারিদ্রের হার কম ছিল বা এই সমস্ত সরকারি হিসেব কোনো এক ঐতিহাসিক সময়ের যার সাথে ৩৭০ ধারার তথা ভূমি সংস্কারের কোনো সম্পর্কই নেই — এমনটা ভেবে নেওয়া ভুল হবে৷ আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, জম্মু-কাশ্মীর এক সময়ে প্রচন্ড অত্যাচারী সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন ছিল, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই কৃষিজীবীদের (প্রধানতঃ মুসলমান) দারিদ্র্য ও অবহেলায় রাখা হতো। লোকমুখে শোনা যায় মহারাজের কর আদায়কারীরা নিজ কাজ আদায়ে এতটাই নিষ্ঠুর ও নির্দয় ছিল যে যখন কৃষকরা জানাতো তারা কোনো ভাবেই রাজ্যকে কর দিতে অপারগ, তখন সেই কর আদায়কারীরা কৃষকদের মুখ খুলতে বলে দাঁতে ভাত লেগে আছে কিনা পরীক্ষা করতো ; তারা বলতো যদি কৃষক ভাত খেতে পারে, তাহলেতার কর দেয়ার ও সামর্থ আছে। এরকম  একটা সামন্তত্রান্তিক সমাজ ব্যবস্থা রূপান্তরিত হয় এমন একটি রাজ্যে  যার দারিদ্রের হার সারা দেশে সর্বনিম্ন — এ সত্যিই এক আশ্চর্য নিদর্শন যা হয়তো অমিত শাহের মনে ধরবে না! তথাপি যে কোনো মাপকাঠিতেই এটি উল্লেখযোগ্য। সমানভাবে উল্লেখযোগ্য এই রূপান্তরে ৩৭০ ধারার বিশেষ অবদান।

----------------

প্রভাত পট্টনায়ক